Saturday, 10 October 2020

আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ-জুল ভার্ন

 


বাগ্মী হিসেবে দুনিয়াজোড়া নাম কিনেছিলেন শেরিডান। আঠারো শতকের প্রথম ভাগে যে-বাড়িটিতে তিনি পরলোকগমন করেন, আঠারো শতকের শেষভাগে সেই বাড়িটিতেই বসবাস করতেন রিফর্ম ক্লাবের সদস্য ফিলিয়াস ফগ। ফগের টাকাকড়ির কোন অভাব নেই। কিন্তু কিভাবে সে-টাকা তাঁর কাছে আসে সে এক বিরাট রহস্য। সবাই তাঁকে রিফর্ম ক্লাবের সদস্য হিসেবেই জানে, কাজকর্ম কিছু কখনও কেউ তাকে করতে দেখেনি। খুব কম কথা বলেন ফগ। কম খরচ করেন। তার সংযম সম্পর্কে লোকের মুখে শুধু প্রশংসাই শোনা যায়। তিনি যে কৃপণ তাও নয়, কেননা প্রচুর পরিমাণে দান করতে দেখা যায় তাঁকে। বিলাসিতা একেবারেই পছন্দ করেন না। কিন্তু ফিলিয়াস ফগ সম্পর্কে সবচেয়ে বড় কথা যেটা তা হলো, ঘড়ির কাটা ধরে দৈনন্দিন কাজকর্ম চলে তার, সময়ের এক সেকেন্ড এদিক ওদিক হবার যো নেই।

অনেকের ধারণা, অনেক দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন ফগ। ভূগোল সম্পর্কে তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যই এই ধারণার কারণ। আসলে লন্ডনের এক ইঞ্চি বাইরেও কখনও পা দেননি ফগ। বাড়ি আর ক্লাব, এদুটো জায়গাতেই তার যাওয়া-আসা সীমিত, এরচেয়ে বেশি দূরে আর কোথাও যাননি কখনও।

ক্লাবে বসে খবরের কাগজ পড়া আর বন্ধুদের সাথে বসে তাস খেলা ছাড়া আর কিছু যেন জানেন না তিনি। মজার ব্যাপার হলো, খেলায় কেউ কখনও তাকে হারতে দেখেনি। প্রচুর টাকা জেতেন তিনি, কিন্তু সে-টাকা নিজে নেন না, দান করে দেন। এ-থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায় ফগ টাকার লোভে তাস খেলেন না। তিনি, সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন হুইস্ট খেলা। হুইস্ট খেলায় খুব বুদ্ধি লাগে বলেই ম্ভবত এ-খেলায় তার সাথে কেউ কখনও জিততে পারে না।

আপনজন বলতে কেউ নেই ফগের। সেভিলরা সেই বাড়িটা বড় বেশি নির্জন, সেখানে তিনি একাই থাকেন। তার সাথে দেখা করার জন্যে বাড়িতে কেউ কখনও আসে না। রিফর্ম ক্লাবেই খাওয়া দাওয়া সারেন তিনি—একা। তার টেবিলে আর কাউকে তার সাথে বসে খেতে দেখা যায় না কখনও। তাঁকে খাবার পরিবেশনের সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকে ক্লাবের ওয়েটাররা। সুস্বাদু এবং সবচেয়ে ভাল জিনিস ছাড়া কিছু মুখে তোলেন না, এ-কথা ভাল করেই জানা আছে তাদের।

রোজ দশ ঘণ্টার বেশি বাড়িতে থাকেন না ফগ। ঘুম আর পোশাক-আশাক পরতেই এই দশ ঘণ্টা খরচ করেন তিনি। জাকজমক নেই, কিন্তু তার বাড়িতে আরাম-আয়েশের সব রকম আয়োজন আছে। তাঁর পরিচারক হলো জেমস। মনিবের মেজাজ বুঝে তাকেও ঘড়ির কাঁটা ধরে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কাজ করার জন্যে এক পায়ে খাড়া থাকতে হয় সব সময়। এই মজার কাহিনীর সূচনা হলো যেদিন সেদিন ফগকে দাড়ি কামাবার জন্যে জেমস যে গরম পানি দিয়েছিল তা ছিয়াশি  ডিগ্রী না হয়ে চুরাশি ডিগ্রী হয়ে গিয়েছিল। সাথে সাথে চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়ে গেল বেচারা।

এই হচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক জুল ভার্নের সবচেয়ে জনপ্রিয়, বিশ্বনন্দিত এ্যাডভাঞ্চর উপন্যাস “আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ” এর সূচনাংশ। ফিলিয়াস ফগ একদিন বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার সময় পত্রিকার একটা রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। বিষয়, সবচেয়ে কম কত দিনে বিশ্ব ভ্রমণ করা সম্ভব। আলোচনা এক সময় তর্কে গড়াল। ফিলিয়াস চ্যালেঞ্জ করে বলে বসলেন, পুরো পৃথিবী মাত্র আশি দিনের মধ্যে ভ্রমণ করা সম্ভবকোন জায়গা থেকে শুরু করে কিভাবে কোন যানে চেপে ভ্রমণ করতে হবে তারও একটা বর্ণনা দিয়ে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে।

ফিলিয়াস ফগের কয়েক বন্ধু দুই হাজার ডলার বাজিও ধরে ফেলল। ফিলিয়াস ৮০ দিনের মধ্যে পৃথিবী ঘুরে আসতে পারলে এই টাকা পাবেন তিনি। কিন্তু অর্থের লোভে নয়, আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন ফিলিয়াস ফগের ভীষণ আঁতে ঘা লাগল। রাজি হয়ে গেলেন তিনি।

ফিলিয়াসের ভীষণ জেদ চেপে গেল। দুর্গম, অজানা, অচেনা পথে পদে পদে বিপদের হাতছানি। কিন্তু যা থাকে কুলকপালে ভেবে বাজি লাগিয়ে দিলেন একরোখা ফিলিয়াস ফগ। শর্ত অনুযায়ী চাকরকে নিয়ে পরদিনই যাত্রা শুরু করলেন তিনি। এরপর শুরু হলো একটানা রুদ্ধশ্বাস দুঃসাহসী সব অভিযান। কখনো বেলুনে, কখনো জাহাজে, কখনো হাতির পিঠে কখনোবা স্রেফ পায়ে হেঁটে তিনি একসময় ভারতে পৌঁছান। সেখানে এক অসহায় মেয়েকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান তাঁরা। পরে সে মেয়েটিও তাদের সফরসঙ্গী হয়। এরপর প্রাণ হাতে নিয়ে একে একে পার হতে থাকেন সাংহাই, প্রশান্ত মহাসাগর, নিউইয়র্ক, শিকাগো, লিভারপুল, আয়ারল্যান্ড। যাত্রাপথে নানা বিপদে জড়িয়ে পড়েন তাঁরা।

ফিলিয়াস ফগ যখন লন্ডন থেকে যাত্রা শুরু করেন তার ঠিক কয়েকদিন পূর্বেই সেখানে এক ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। লন্ডনের এক গয়েন্দা ধারণা করেন এই ডকাতির পেছনে ফগের হাত থাকতে পারে। সেই গোয়েন্দাও ফগের পিছু নেয়। সেটা আরো এক রহস্যের সৃষ্টি করে। তবে নাটকীয়ভাবে সবকিছু থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে অবশেষে নিজের শহরে ফিরে আসেন ফিলিয়াস আর তার পরিচারক। কিন্তু ততক্ষণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ১০ মিনিট দেরি হয়ে গেছে ফগের। ভীষণ মুষড়ে পড়েন ফিলিয়াস। হতাশ হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না করে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু তখনই এক নাটকীয় ঘটনা ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত ফিলিয়াসই জিতে নেন বাজি’র পুরো দুই হাজার ডলার। কিন্তু কীভাবে? সেটি না হয় বই পড়েই জেনে নেবেন।

উল্লেখ্য এই ছবির কাহিনী নিয়ে চলচিত্রও হয়েছে হলিউডে। 

বইটির একটি পিডিএফ সংস্করণ ডাউনলোড করে নিতে পারেন এই লিংকে ক্লিক করে।


No comments:

Post a Comment