Saturday, 2 May 2020

'সসেমিরা' মহারাজ নন্দ ও গুরু শারদানন্দ (৩২ পুতুলের উপখ্যান)


মহাকবি কালিদাস
রাজা বিক্রমাদিত্য ও গুরু সারদানন্দ (সংস্কৃতে মহাকবি কালিদাস বত্রিশ পুতুলের উপখ্যান-এর বাঙ্গাল অনুবাদ)
বিশালা নগরে নন্দ নামে মহাশক্তিমান এক রাজা ছিলেন। তাঁর পুত্রের নাম জয়পাল, মন্ত্রীর নাম বহুশ্রুত, পত্মীর নাম ভানুমতী। মন্ত্রী বহুশ্রুত ছয় প্রকার দণ্ডশাস্ত্রবিদ্যা জানতেন। ভানুমতী রাজার অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। রাজা যখন সিংহাসনে বসতেন তখন ভানুমতী তাঁর বাঁ দিকে অর্ধাঙ্গে থাকতেন। তিনি মুহূর্তকালও ভানুমতীকে ছেড়ে থাকতে পারতেন না। একদিন মন্ত্রী মনে মনে ভাবলেন, ‘এই রাজা নির্লজ্জের মতো সভামধ্যে পত্মীকে নিয়ে সিংহাসনে বসেন। সকলেই রানীকে দেখে। এ অত্যন্ত অনুচিত।’ তিনি একদিন অবসর বুঝে রাজাকে বললেন, মহারাজ! আপনার কাছে আমার একটি বিষয় নিবেদন করার আছে।
       রাজা বললেন, কী, বলো। 


       মন্ত্রী বললেন, অসূর্যস্পশ্যা ভানুমতী যে আপনার সঙ্গে সভামধ্যে বসেন, শাস্ত্রকারেরা বলেন, এ অনুচিত। নানারকম লোক এসে তাঁকে দেখে।

       রাজা বললেন, সবই জানি। কিন্তু কি করি? এই ভানুমতিতে আমি অত্যন্ত অনুরক্ত। একে ছেড়ে আমি ক্ষণকালও থাকতে পারি না।
       মন্ত্রী বললেন, তাহলে এক কাজ করুন।
       রাজা বললেন, কী করবো, স্থির করো।
       মন্ত্রী বললেন, চিত্রকরকে ডেকে তাকে দিয়ে ভানুমতীর একখানা ছবি আঁকিয়ে নিন। সেই ছবি সামনের দেয়ালে আটকে রেখে সর্বদা তাঁর রূপ দেখুন।
       রাজার মনে হলো মন্ত্রীর কথা ঠিক। তিনি চিত্রকরকে আহ্বান করে বললেন, তুমি ভানুমতীর মূর্তি ছবিতে এঁকে দাও।
চিত্রকর বললে, আমি তাকে চোখে দেখলে ঠিকমতো একে দিতে পারি।
তাই শুনে রাজা ভানুমতীকে আহ্বান করে চিত্রকরকে দেখালেন
চিত্রকর রানীকে দেখে বুঝলো যে, এই নারী পদ্মিনী রমণীর লক্ষণে সুশোভিতা। তখন সে পদ্মিনী-লক্ষণযুক্ত ভানুমতীর ছবি একে রাজার হাতে দিল। রাজা ছবিখানি দেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে তাকে পুরস্কার দিলেন।
তারপর রাজগুরু শারদানন্দ এসে চিত্রপটে ভানুমতীর মূর্তি দেখে বললেন, এহে চিত্রকর! ভানুমতীর সকল লক্ষণই তুমি চিত্রিত করেছে। কিন্তু একটি মাত্র চিহ্ন আঁকিতে তোমার ভুল হয়েছে।
চিত্রকর বললে, প্রভু! কী ভুল হয়েছে বলুন।
তখন শারদানন্দ বললেন, ভানুমতীর বাম উরুতে তিলকাকার একটি মৎস্যচিহ্ন আছে, তুমি সেটি চিত্রে আঁকনি। শারদানন্দের এই কথা শুনে রাজা এক সময়ে রানীর বাম উরু পরীক্ষা করে দেখলেন, সত্য সত্যই তিলকাকার একটি মৎস্যচিহ্ন রয়েছে। তাই দেখে রাজা চিন্তা করলেন, ভানুমতীর এই চিহ্ন শারদানন্দের চোখে পড়লো কেমন করে? নিশ্চয় এর সঙ্গে শারদানন্দের সংযোগ ঘটেছে। না হলে সে কেমন করে এটা জানতে পারবে। এমনি নানা কথা মনে ভেবে রাঙ্গা মন্ত্রীকে সকল কথা বললেন।
বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান মন্ত্রীও সেই সময়ে রাজার সঙ্গে একমত হয়ে বললেন, রাজন, কার মনে কি আছে, কে বুঝতে পারে? আপনি যা বললেন তা সত্য হলেও হতে পারে।
রাজা বললেন, মন্ত্রি ! তুমি যদি আমার প্রিয়পাত্র হত তাহলে শরদানন্দকে বধ
মন্ত্রী তাই হবে বলে সকলের সামনে শারদানন্দকে বন্দী করলেন।
তখন শারদানন্দ বললেন, লোকে যে বলে, রাজা কখনও কারো প্রিয়পাত্র হন না, একথা সত্য। শাস্ত্রেও বলে, কোন ব্যক্তি অর্থশালী হয়ে গর্বিত না হয়? কোন্ বিষয়ী ব্যক্তির অপদ না। ঘটে? কোন্ ব্যক্তি বা রাজার প্রিয় হয় ? কোন্ ব্যক্তি না কালের অধীন ? কোন্ ব্যক্তি বা দুর্জনের কুটজালে বদ্ধ হয়ে। কল্যাণের সঙ্গে পরিত্রাণ পায় ? শাস্ত্রে বলে, রাজকোষে পতিত হলে পবিত্র অপবিত্র, পটু অপটু, বীর ভীরু, দীর্ঘায়ু অল্পায়ু এবং সংকুলঞ্জ কুলান হয়।
তারপর মন্ত্রী যখন শারদানন্দকে নিয়ে বধ্যভূমিতে গেলেন, তখন শারনিন্দ এই শ্লোক আবৃওি করলেন, বনে, যুদ্ধক্ষেত্রে, শত্রুর কাছে, জমধ্যে, অগ্নিধ্যে, মহাসারে, পর্বতশিখরে, প্রমত্র বা বিপজ্জনক অবস্থায় মানুষ যেমনই থাকুক পূর্বের পুণ্য তাকে রক্ষা করে।
তখন মন্ত্রী মনে মনে চিন্তা করলেন, ব্যাপারটি সত্য হোক বা মিথ্যা হোক আমি ব্ৰহ্মহত্যা করি কেন? কাজটি করা নিতান্ত অনুচিত।
এই ভেবে তিনি অন্যের অজ্ঞাতসারে শারদানন্দকে গুপ্ত ভবনে নিয়ে গিয়ে ভূনিম্নের কক্ষে রেখে রাজার কাছে এসে বললেন, মহারাজ! আপনার আজ্ঞা পালন করা হয়েছে।
রাজা বললেন, ভাল করেছে।
তারপর রাজকুমার একদিন মৃগয়া করতে বনে গেলেন। যাত্রাকালে নানারকমের অমঙ্গল চিহ্ন দেখা গেল।
মন্ত্রিপুত্র বুদ্ধিসাগর তখন রাজকুমারকে বললেন, জয়পাল আজ মৃগয়ায় যাত্রা করো না। অমঙ্গলের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।
জয়পাল বললেন, এমন কুলক্ষণে আমার বিশ্বাস নেই।
মন্ত্রিপুত্র বললেন, রাজকুমার! এমন অহিতকর কুলক্ষণে বিশ্বাস করা বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণের বশ্য কর্তব্য।
রাজপুত্র মন্ত্রিপুত্রের নিষেধ উপেক্ষা করে মৃগয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা। করলেন।
যাত্রাকালে মন্ত্রিপুত্র আবার বললেন, জয়পাল! তোমার জীবননাশ হবার সময় এসেছে। না হলে এমন বুদ্ধির উদয় হবে কেন? কেউ কখন সোনার হরিণ দেখে নি, কেউ কখন তা পায়ও নি বা তার কথা কেউ কখন শোনে নি। তবু সোনার হরিণ ধরবার বাসনা রামের মনে জাগলো। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, বিনাশকালে বিপরীত বুদ্ধির উদয় হয়।
তারপর রাজকুমার বনে গিয়ে বহু হিংস্র পশু বধ করলেন। তারপর একটি কৃষ্ণসার হরিণ দেখে তাকে বধ করবার উদ্দেশ্যে তার পিছনে যেতে যেতে দেখলেন, তিনি গহন বনে এসে পড়ছেন। সৈন্যের সকলে নগরের পথে চলে গেছে। সঙ্গে কেউ নেই। সেই সময়ে কৃষ্ণসারও অদৃশ্য। রাজকুমার একাকী অশ্বপৃষ্ঠে বনে ঘুরতে ঘুরতে একটি সরোবরের ধারে এসে পড়লেন। সেখানে ঘোড় থেকে নেমে তাকে জল খাইয়ে ও গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে যেমন একটি গাছতলায় গিয়ে বসলেন, অমনি সেখানে ভয়ঙ্করমূর্তি এক বাঘ এলো
বাঘ দেখে ঘোড়াটি দড়ি ছিড়ে নগরের দিকে ছুটলো। রাজকুমারও ভয়ে কাপতে কাপতে একটি গাছের ডাল ধরে গাছটিতে চড়লেন। ইতিপূর্বে একটি ভালুকও সেই গাছে চড়ে বসে ছিল। তাকে দেখে রাজকুমার আবার আরও বেশি ভয় পেলেন।
তখন ভালুক বললে, রাজকুমার, তোমার ভয় নেই। আজ তুমি আমার শরণ নিয়েছে। সুতরাং আমি তোমার একটুও অনিষ্ট করবো না। আমাকে বিশ্বাস করে। ঐ বাঘের জন্য তোমার কোন ভয় নেই।
রাজপুত্র বললেন, ভালুক জ আমি তোমার শরণাগত। অত্যন্ত ভয় পেয়েছি। অতএব শরণাগতকে রক্ষা করলে তোমার মহাপুণ্য হবে। শাস্ত্রে বলে, একদিকে সহস্র দক্ষিণা দান করে যে য, অন্যদিকে প্রাণভয়ে ভীত যে তার জীবন রক্ষা, এই দুটি কাজের ফল একই ভালুকের আশ্বাসে রাজপুত্র আশ্বস্ত হলেন। এমন সময়ে সেই বাঘও গাছটির তলায় এসে পড়লো। আর সূর্য অস্ত গেল। অত্যন্ত শ্রান্ত হওয়ার ফলে রাজপুত্রের ঘুম আসতে লাগলো। তখন ভালুক বললে, রাজকুমার! তুমি ঘুমের ঘোরে গাছ থেকে পড়ে যাবে। আমার কোলে এসে ঘুমাও।
তাই শুনে রাজকুমার ভালুকের কোলে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
তখন বাঘ ভালুককে ডেকে বললে, হে ভালুক ! ঐ লোকটা গ্রামবাসী। আবার কখন বনে মৃগয়ায় এসে আমাদের বধ করতে পারে। লোকটা শত্রু। কেন ওকে কোলে করে রেখেছে। কারণ ও মানুষ। বাঘ, বানর ও সাপেদের কাজ-কর্মের কথা বলছি না, পক্ষী জাতীয় প্রাণীকে যেসব কাজ করতে দেখা যায় মানুষকে তা করতে দেখা যায় না। তুমি এর উপকার করলেও এই লোকটা তোমার অনিষ্ট করবে। তুমি ওকে নিচে ফেলে দাও, আমি খেয়ে চলে যাই, তুমিও বাড়ি যাও।
ভালুক বললে, লোকটি যে চরিত্রেরই হো, আমার শরণ নিয়েছে, আমি একে নিচে ফেলে দিতে পারবে না। শরণাগতকে বধ করলে মহাপাপ হয়। শাস্ত্রেও বলে, যারা বিশ্বাসঘাতক আর যারা শরণাগতকে হত্যা করে মহাপ্রলয়কাল পর্যন্ত তাদের নরকবাস কতে হয়।
তারপর রাজপুত্রের নিদ্রাভঙ্গ হলো। তখন ভালুক তাকে বললে, রাজপুত্র। আমি একটু নিদ্রা যাবে। তুমি সাবধানে থাকো।
রাজপুত্র বললেন, তাই হোক।
ভালুক রাজপুত্রের কাছে ঘুমো লাগলো
সেই সময়ে বাঘ রাজপুত্রকে বললে, রাজকুমার। তুমি এই ভালুককে বিশ্বাস করে না। কারণ এ নখী। শাস্ত্রে বলে, নদী, নখী, শুঙ্গী এ অস্ত্রধারীকে বিশ্বাস করতে নেই; স্ত্রীজাতি ঐ রাজবংশীয়কেও বিশ্বাস করবে না। এই ভালুককে চপলচিত্ত বোধ হচ্ছে। সুতরাং এর প্রসন্নতাও সাংঘাতিক। শাস্ত্রে বলে, যারা কখন তুই কখন রুষ্ট, কখন না রুই-তুষ্ট, এই রকম অব্যবস্থিত। বাক্তিদের প্রসন্নভাবও ভয়ঙ্কর। এই ভালুক আমার হাত থেকে রক্ষা করে স্বয়ং তোমাকে খাবার ইচ্ছা করছে। অতএব তুমি ওকে নিচে ফেলে দাও। আমি ওকে খেয়ে চলে যাই, তুমি বাড়ি চলে যাও।
এই কথা শুনে রাজপুত্র ভালুককে যেমন নিচে ফেলে দিলেন, ভালুকও অমনি পড়তে পড়তে গাছে একটি ডাল চেপে ধরলো। তাই দেখে রাজপুত্র শ্রাবার ভয় পেলেন।
তখন ভালুক রাজপুত্রকে বললে, রে পাপিষ্ঠ! ভয় পাচ্ছি কেন? আগে যে কাজ করেছিস, এখন তোক তার ফল ভোগ করতেই হবে। সুতরাং তুই এখন সসেমিরাএই কথা বলতে বলতে পিশাচ হয়ে ঘুরে বেড়াবি।
এদিকে সকাল হলো, বাঘ সেখান থেকে চলে গেল। ভালুকও রাজপুত্রকে অভিশাপ দিয়ে সেখান থেকে স্বস্থানে চলে গেল।
তখন থেকে রাজকুমার ‘সসেমিরা ‘সসেমিরা বলতে বলতে বনে বনে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
রাজকুমারের ঘোড়াটি তাকে দেখতে না পেয়ে রাজধানীতে চলে গিয়েছিল। সওয়াহীন ঘোড়া দেখে রাজধানীর লোকেরা রাজার কাছে গিয়ে জানালো, কেবল ঘোড়াটি ফিরে এসেছে।
তখন রাজা মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, মন্ত্রি! যে সময়ে কুমার মৃগয়ায় যাত্রা করে সে সময়ে বহু রকমের অশুভ লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। সে সব গ্রাহ্য না করে কুমার যেমন যাত্রা করেছিল, বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান এখন তার প্রত্যক্ষ ফল ফলছে। অতএব আমি তার সন্ধানে বনে যাবো।
মন্ত্রী বললেন, মহারাজ ! তাই করা কর্তব্য।
তারপর রাজা ও মন্ত্রী পরিবারবর্গকে নিয়ে যে পথে রাজকুমার মৃগয়ায় যাত্রা করেছিলেন সেই পথে বনে গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে দেখলেন, রাজকুমার ‘সসেমিরা সসেমিরা বলতে বলতে পিশাচাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাই দেখে রাজা গভীর দুঃখে রাজকুমারকে নিয়ে রাজধানীতে ফিরে এলেন। অনেক সুবিজ্ঞ বৈদ্যকে ডাকিয়ে আনা হলো। কিন্তু রাজকুমার কারও চিকিৎসাতেই সুস্থ হলেন না।
তখন রাজা বিমর্ষমুখে বললেন, মন্ত্রি, এখন যদি শারদানন্দ বেঁচে থাকতেন তাহলে নিমেষে চিকিৎসা করে রাজকুমারকে সুস্থ করে তুলতেন। আমি তাকে হত্যা করেছি। লোকে যে কাজ করে আগে বিবেচনা করে তা করা উচিত। নতুবা মহা বিপদের সম্ভাবনা। শাস্ত্রেও বলে, যে বিবেচনা করে কাজ করে, গুণমুগ্ধ সম্পদ স্বয়ং এসে তাকে বরণ করে। বিনা পরীক্ষায় কোন কাজ করা উচিত নয়, পরীক্ষা করে কাজে নিযুক্ত হওয়া উচিত। যখন আমি শারদানন্দকে বধ করি তখন কেউই আমাকে বারণ করে নি।
মন্ত্রী বললেন, যা হয়েছে তা সেই কালেরই উপযুক্ত। যেমন ভবিতব্য, বুদ্ধিও তেমন হয়। ভবিতব্যতা না থাকলে যত্ন করলেও তা ঘটে না! কিন্তু ভবিতব্য থাকলে বিনা যজ্ঞেও তা ঘটে। যার ভবিতব্য নেই, হাতে পেলে ও তা বিনষ্ট হয়!
রাজা বললেন, এখন রাজকুমার সম্বন্ধে যান হওয়া বিশেষ কর্তব্য।
মন্ত্রী বললেন, কি ভাবে ?
রাজা বললেন, যে চিকিৎসা করে কুমরিক নীরোগ করতে পারবে তাকে অর্ধেক রাজ্যদান করবোকথা সর্বত্র ঘোষনা করে দাও
রাজার আদেশ অনুসারে কাজ রে মন্ত্রী নিজ গৃহে ফিরে এলেন এবং মন্ত্রণাকরে শারদানন্দকে সব কথা জানালেন।
সব শুনে শারদানন্দ বললেন, মন্ত্রি, আপনি তার কাছে গিয়ে এই কথা বলুন যে, আমার একটি মেয়ে আছে। যাতে কুমারের সঙ্গে তার দেখা হয় তা করুন। সেই মেয়ে রাজকুমারের আরোগ্যের উপায় করবে।
মন্ত্রী রাজার কাছে গিয়ে তাই বললেন।
তখন রাজা পাত্রমিত্রসভাসদগণকে নিয়ে মন্ত্রীর বাড়ি এলেন। সকলেই যথাযথ স্থানে বসলেন। রাজকুমার ও ‘সসেমিরা' ‘সসেমিরা বলতে বলতে সেখানে এসে আসন গ্রহণ করলেন।
তখন শারদানন্দ আড়ালে থেকে এই শ্লোকটি পাঠ করলেন, যে সুহৃৎ সদ্ভাবে এসেছেন তাকে প্রতারণা করে কী নিপুণতা দেখানো হয়েছে? ক্রোড়ে শয়ন করে যে নিদ্রা যাচ্ছে, তাকে হত্যা করলে কী পৌরুষ হয় ?
এই কথা শশানামাত্র রাজকুমার ‘সসেমিরা’ শব্দের প্রথম বর্ণ ‘স’ বাদ দিয়ে কেবল ‘সেমিরা শব্দ উচ্চারণ করতে লাগলেন। তখন শাৱদানন্দ আবার এই শ্লোকটি পাঠ করলেন, সেতুবন্ধ রামেশ্বর ও সাগরসঙ্গমে গেলে ব্ৰহ্মহত্যা পাপ বিনষ্ট হয়, কিন্তু যে ব্যক্তি মিত্রদ্রোহী, কোথাও তার মুক্তি নেই।'
এই শ্লোক শোনামাত্র রাজকুমার ‘সসে’ বাদ দিয়ে কেবল ‘মিরা বলতে লাগলেন।
তখন শারদানন্দ তৃতীয় শ্লোকটি বললেন, “যতদিন মহাপ্রলয় উপস্থিত না হয় ততদিন কত, বিশ্বাসঘাতক ও মিত্রদ্রোহীকে নরকবাস করতে হয়।
এই শ্লোক শোনামাত্র রাজকুমার সসেমি বাদ দিয়ে কেবল ‘র’ উচ্চারণ করতে লাগলেন।
এখন শারদানন্দ এই চতুর্থ শ্লোকটি বললেন, “মহারাজ! আপনি যদি কুমারের কল্যাণ কামনা ইচ্ছা করেন, তবে ব্রাহ্মণগণকে দান ও দেবগণকে আরাধনা করুন।
শ্লোকটি শোনামাত্র রাজকুমার সুস্থ হয়ে উঠলেন। তার জ্ঞান হলে তিনি পিতার কাছে ভালুকের সকল বৃত্তান্ত নিবেদন করলেন।
তখন রাজা বললেন, কুমারি! তুমি গ্রামবাসিনী, কখন বনে যাও নি, তবে ভালুকের বৃত্তান্ত জানলে কেমন করে?
যবনিকান্তরালবর্তী শারদানন্দ তখন বললেন, দেবতা ও ব্রাহ্মণের প্রসাদে আমার জিহবায় সরস্বতী বিরাজ করেন। তার প্রসাদেই আমি যেমন ভানুমতীর উরুতে তিলকের কথা জেনেছিলাম, সেই ভাবে এই কথাও জানতে পেরেছি।
এই কথা শুনে রাজার বিস্ময়ের সীমা রইলো না। তিনি পর্দাখানি টেনে সরিয়ে ফেলতেই, শারদানন্দকে দেখতে পেলেন। তখন রাজা ও আর সকলে তাকে প্রণাম করলেন। মন্ত্রীও পূর্বের কথা শ্ৰকাশ করলেন।
তখন রাজা বহুত মন্ত্রীকে সম্বোধন করে বললেন, মন্ত্রি। তোমার সংসর্গে আমি কীর্তিমান হলাম, দুর্গতিও দূর হলো। এখন বুঝলাম, সৎসংসর্গ করা পুরুষের কর্তব্য। সৎসংসর্গ বর্তমান ও ভাবী উভয়বিধ বিপদই দূর কয়ে। জাহ্নবীজল পান কয়লে পিপাসা দূর হয়, দুর্গতিও বিনষ্ট হয়ে থাকে। তোমার বুদ্ধিকৌশলেই রাজকুমার বিপদ থেকে মুক্ত হয়েছে। এই রকম মহৎ কুলে যে ব্যক্তির জন্ম তার সংসর্গ করাই রাজার কর্তব্য। শাস্ত্রেও বলে, সর্পমন্ত্র-বিশারদগণ যেমন সর্প সংগ্রহ করে তেমনি কুলীন মন্ত্রী সংগ্রহ করাও রাজার কর্তব্য। সেইরূপ মন্ত্রী গর্বের।
এইভাবে নানারকমের স্তুতিবাদের দ্বারা মন্ত্রীর স্তব করে, তাঁকে বস্ত্র ইত্যাদি দানে সম্মান দেখিয়ে রাজা রাজ্য করতে লাগলেন। 

No comments:

Post a Comment